মদিনা শরীফ · প্রথম হিজরি শতক

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উনার হুজরা শরীফ

হিজরতের পর মসজিদে নববীর পাশে আম্মাজানগণ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না উনাদের জন্য কাঁচা ইট ও খেজুর গাছ দিয়ে ছোট ছোট ঘর তৈরি হয়। মসজিদের পূর্ব পাশে, মসজিদের সাথে লাগোয়া ছিল আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উনার হুজরা শরীফ। ভেতরে হেঁটে দেখুন, আর প্রতিটি জিনিসে ক্লিক করে জানুন তার সাথে জড়িত হাদিস ও সুন্নাত।

হাদিস ও সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী এটি একটি আনুমানিক পুনর্নির্মাণ। সঠিক মাপ ও সাজসজ্জা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

W A S D হাঁটা মাউস টেনে চারদিকে দেখা জিনিসে ক্লিক করে তথ্য

হুজরা শরীফের জিনিসপত্র

হাদিস ও সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী এটি একটি আনুমানিক পুনর্নির্মাণ। সঠিক মাপ ও সাজসজ্জা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

ঘরের গঠন

দরজা ও পর্দা

হুজরা শরীফের দরজা সরাসরি মসজিদে নববীর দিকে খুলত। দরজায় কাঠের কপাট ছিল না, ঝুলত চুল বা পশমের মোটা একটি পর্দা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই পর্দা সরিয়েই ঘর থেকে মসজিদে তাশরীফ নিতেন।

হযরত কা'ব ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, মসজিদে উনার ও আরেকজনের কথা উঁচু হয়ে গেলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হুজরার পর্দা সরিয়ে বের হলেন এবং উনাকে ডাক দিলেন।সহীহ বুখারী ৪৫৭
সুন্নাতঘরে ঢোকার সময় ঘরের লোকদের সালাম দেওয়া (সূরা নূর ২৪:৬১)।
পোশাক

না'লাইন শরীফ

চামড়ার সোল আর ফিতার সাধারণ চপ্পল। দরজার বাইরে খুলে রাখা।

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার না'লাইন শরীফের প্রতিটিতে দুটি করে ফিতা ছিল।সহীহ বুখারী ৫৮৫৭
সুন্নাতপরার সময় ডান পা আগে, খোলার সময় বাম পা আগে (সহীহ বুখারী ৫৮৫৬)।
পবিত্রতা

মিসওয়াক

আরাক গাছের ডাল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা হতো। ঘরে ঢুকেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে মিসওয়াক করতেন, তাই এটি তাকের উপর হাতের কাছে রাখা।

হযরত শুরাইহ ইবনে হানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা উনাকে জিজ্ঞেস করলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে কী করতেন? উনি বললেন: মিসওয়াক।সহীহ মুসলিম ২৫৩
সুন্নাতঅজু ও নামাজের আগে মিসওয়াক করা (সহীহ বুখারী ৮৮৭)।
ঘরের গঠন

খেজুর কাণ্ডের ছাদ

দেয়াল কাঁচা ইটের। ছাদ খেজুর গাছের কাণ্ডের বীমের উপর খেজুরের ডাল-পাতা বিছিয়ে মাটির প্রলেপ দিয়ে তৈরি। ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকত, আর ঘরে কোনো বাতি থাকত না।

ইমাম হাসান বসরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উনার খিলাফতের সময় আমি আম্মাজানগণ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুন্না উনাদের ঘরে প্রবেশ করতাম, আর হাত বাড়িয়ে ছাদ ছুঁতে পারতাম।আল-আদাবুল মুফরাদ ৪৫০
আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, সে সময় ঘরগুলোতে বাতি ছিল না।সহীহ বুখারী ৩৮২
বসা ও খাওয়া

খেজুর পাতার চাটাই

মেঝে ছিল মাটির। তার উপর খেজুর পাতার বোনা চাটাই বিছিয়ে বসা, খাওয়া আর নামাজ পড়া হতো।

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি চাটাই ছিল। দিনে উনি তা বিছিয়ে রাখতেন, আর রাতে তা দিয়ে ঘিরে নিয়ে নামাজ পড়তেন।সহীহ বুখারী ৭৩০
সুন্নাতমেঝেতে বসে খাওয়া। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো উঁচু টেবিলে খাননি (সহীহ বুখারী ৫৩৮৬)।
পানাহার

কাঠের পেয়ালা

কাঠের মোটা পেয়ালা। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার এমন একটি পেয়ালা পরে হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উনার কাছে সংরক্ষিত ছিল।

হযরত আসিম আল-আহওয়াল রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু উনার কাছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পেয়ালা দেখেছি। সেটি ফেটে গিয়েছিল, আর রুপা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছিল।সহীহ বুখারী ৫৬৩৮
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পান করার সময় তিনবার শ্বাস নিতেন।সহীহ মুসলিম ২০২৮
সুন্নাতবিসমিল্লাহ বলে, ডান হাতে, বসে, তিন শ্বাসে পান করা।
পানাহার

খেজুরের ঝুড়ি

খেজুর পাতার বোনা ঝুড়িতে খেজুর রাখা হতো। মদিনা শরীফের ঘরে এটিই ছিল প্রধান খাবার।

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ঘরে খেজুর নেই, সে ঘরের লোকেরা ক্ষুধার্ত।সহীহ মুসলিম ২০৪৬
সুন্নাতখেজুর দিয়ে ইফতার করা (সুনান আবু দাউদ ২৩৫৬)।
পানাহার

ঢাকনা দেওয়া মাটির কলস

পানি রাখা হতো মাটির কলসে, যা পানিকে ঠান্ডা রাখে। কলসের মুখ সবসময় ঢেকে রাখা হতো।

হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: রাতে পাত্রগুলো ঢেকে রাখো এবং মশকের মুখ বেঁধে রাখো।সহীহ বুখারী ৫৬২৩; সহীহ মুসলিম ২০১২
সুন্নাতঘুমানোর আগে বিসমিল্লাহ বলে পাত্র ঢেকে রাখা।
নামাজ

খুমরা (ছোট জায়নামাজ)

খেজুর পাতার ছোট জায়নামাজ, যাতে শুধু মুখ ও হাত রাখার জায়গা হয়। মদিনা শরীফ থেকে কিবলা দক্ষিণ দিকে, তাই এটি দক্ষিণমুখী রাখা।

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন: মসজিদ থেকে খুমরাটি এনে দাও।সহীহ মুসলিম ২৯৮
সুন্নাতনফল নামাজ ঘরে পড়া (সহীহ বুখারী ৪৩২)।
ঘুম

আঁশের রশিতে বোনা খাট

কাঠের ফ্রেমে খেজুর গাছের আঁশের রশি দিয়ে বোনা সাধারণ খাট, উপরে পশমের ডোরাকাটা চাদর।

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাছে গিয়ে দেখলাম, উনি খেজুর পাতার বুননের উপর শুয়ে আছেন, মাঝে কোনো বিছানা নেই, আর বুননের দাগ উনার পাঁজরে বসে গেছে।সহীহ বুখারী ৪৯১৩; সহীহ মুসলিম ১৪৭৯
সুন্নাতঅজু করে ডান কাতে শোয়া (সহীহ বুখারী ২৪৭)।
ঘুম

খেজুর আঁশ ভরা চামড়ার বালিশ

চামড়ার খোলের ভেতর খেজুর গাছের আঁশ ভরে বালিশ ও বিছানা তৈরি হতো।

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছানা ছিল চামড়ার, যার ভেতরে খেজুর গাছের আঁশ ভরা ছিল।সহীহ বুখারী ৬৪৫৬; সহীহ মুসলিম ২০৮২
সুন্নাতশোয়ার আগে বিছানা ঝেড়ে নেওয়া (সহীহ বুখারী ৬৩২০)।
সাজসজ্জা

সুগন্ধির শিশি

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুগন্ধি খুব পছন্দ করতেন। মিশক ও অন্যান্য সুগন্ধি ছোট শিশিতে রাখা হতো।

আম্মাজান আয়িশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, আমার কাছে যে সবচেয়ে উত্তম সুগন্ধি থাকত, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে তা লাগিয়ে দিতাম।সহীহ বুখারী ৫৯২৩
সুন্নাতকেউ সুগন্ধি উপহার দিলে ফিরিয়ে না দেওয়া (সহীহ বুখারী ২৫৮২)।
সাজসজ্জা

ইসমিদ সুরমার পাত্র

ইসমিদ পাথর গুঁড়ো করে তৈরি সুরমা ছোট পাত্রে রাখা হতো, সাথে লাগানোর কাঠি।

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা বর্ণনা করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: তোমরা ইসমিদ সুরমা লাগাও; এটি দৃষ্টি উজ্জ্বল করে এবং চোখের পাপড়ি গজায়।সুনান তিরমিযী ১৭৫৭
সুন্নাতরাতে প্রতি চোখে তিনবার করে সুরমা লাগানো (সুনান তিরমিযী ১৭৫৭)।